
উত্তরাখন্ড রাজ্যের চামোলি জেলায় অবস্থিত মানা ভিলেজ। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ৩২০০ মিটার বা সাড়ে দশ হাজার ফুট।।জাতীয় সড়ক ৫৮ সরাসরি মানাকে যুক্ত করেছে বাকি ভারতের সঙ্গে। ঋষিকেশ, রুদ্রপ্রয়াগ, বদ্রীনাথ হয়ে অবশেষে মানা গ্রামে পৌঁছানো যায়। এরপর এই সড়ক মানা পাসে মিশেছে। দেবভূমি গাড়োয়ালের অন্যতম আকর্ষণ হল চারধাম যাত্রা। এই পথেই আপনি ঘুরে আসতে পারেন ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’ থেকে। বদ্রীনাথ মন্দির থেকে এই গ্রাম মাত্র ৩ কিমি দূরে। অত্যন্ত দুর্গম এই গ্রামের জনসংখ্যা মাত্র ৩৫০-৪০০ জনের মতো। অধিকাংশই দ্রারিদ্র সীমার নীচে, উপার্জন বলতে পর্যটন মরশুমে বদ্রীনাথে কুলির কাজ করা এবং হোটেল গুলোতেই সাময়িক ফাই ফরমাশ খাঁটা।

এখানকার বাসিন্দারা হিন্দি কমই জানেন, কথা বলেন গাড়োয়ালি ভাষায়। মূলত এরা জডস ও বোথাস সম্প্রদায় ভুক্ত। পূর্বে এই সম্প্রদায় তিব্বতিদের সাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে বদ্রীনাথ মন্দিরের হিন্দু সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। ভারতের শেষ গ্রাম বলে পরিচিত এই মানা গ্রামে বর্তমানে পর্যটন বিকাশের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে উত্তরাখণ্ড সরকার। সম্প্রতি দূরদর্শণের এক খবরে প্রকাশ, উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার আধিকারিকরা ১৮ জুলাই মানা গ্রাম পরিদর্শন করেন। তারা সেখানে চলমান নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করে দেখেন। দেশের শেষ গ্রাম ‘মানা’ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নতুন ভাবে সাজিয়ে তোলার বিষয়ে সেখানে পরিদর্শন করেন সরকারি আধিকারিকরা।

হিমালয়ের কোলে অপরূপ সৌন্দর্যের এই মানা গ্রাম ভারত-চিন (তিব্বত) সীমান্ত থেকে মাত্র আড়াই কিমি আগে অবস্থিত। তাই এই গ্রামকেই ভারতের শেষ গ্রাম বলে থাকেন সকলে। উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় যোশীমঠ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সরস্বতী নদীর তীরে গ্রামটির সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা প্রায় সাড়ে দশ হাজার ফুট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিরীখে এই গ্রাম পর্যটকদের মনে আজীবন মনে রাখার মতো ফ্রেম হয়ে থাকতে পারে। এই গ্রামের আশেপাশে আরও কয়েকটি দর্শণীয় স্থান রয়েছে। যেগুলি হল- নীলকণ্ঠ, তপ্ত কুণ্ড, বসুধারা ফলস, ব্যাস গুহা, গুহা, সরস্বতী মন্দির, ভীমপুল, মাতা মূর্তি মন্দির ও হেমকুণ্ড। এরমধ্যে বেশিরভাগই হাঁটা পথে বা ট্রেকিং করে যেতে হবে। মানা গ্রামে বসবাসকারী মানুষজনের সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীও এই গ্রামের উন্নতিতে এগিয়ে আসে। জানা যায় ১৯৯৯ সালে চীনা সৈনিকরা তিব্বত বর্ডার দিয়ে আচমকা ভারতে ঢুকে পড়ে। চীনা সৈনিকরা ভারতের গোবিন্দঘাট পর্যন্ত চলে আসে। সেই সময় মানা গ্রামের যুবক ও মহিলারা চীনা সৈনিকদের গতিবিধি ভারতীয় সেনাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। ওই সময় চীনা সৈনিকরা প্রায় তিন দিন ধরে দখল করেছিল ভারতীয় ভূখণ্ড। গ্রামবাসীদের সাহায্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধে চিনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এই গল্প মানা গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরলেই শুনতে পাবেন। ২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী মানা গ্রামের জনসংখ্যা ১২০০। তবে সরকার থেকে এই গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখানে পাওয়া যায় এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারও। এই গ্রামের জমিতে আলু, বাধাকপি, ফুলকপি, গাজর ফলে। এখানকার যুবকেরা অতি উচ্চতায়, অত্যন্ত ঠান্ডায় এবং বরফে ক্ষিপ্র গতিতে চলাফেরা করতে পারে যা সাধারন মিলিটারিরা পারে না। জানা যায় চিনা সরকার মানা গ্রামের অধিবাসীদের প্রস্তাব পাঠায়, তাঁরা তিব্বতে আসলে তাঁদের জায়গা জমি দেওয়া হবে। কিন্তু মানা গ্রামের অধিবাসীরা পত্রপাঠ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভারতে থাকার অঙ্গীকার করে। তাই ভারতীয় সেনা ও উত্তরাখন্ড সরকার দু হাত ভরে এই অঞ্চলের উন্নতিতে হাত লাগিয়েছে।

উত্তরাখন্ডের চামেলি জেলার প্রান্তিক গ্রামটিতে সর্বসাকুল্যে ২৫০টি পরিবারের বাস। মে থেকে সেপ্টেম্বরের দিনগুলোতে গেলে গাঁয়ের লোকেদের সঙ্গে ইয়াক চড়াতে যেতে পারেন পাহাড়ের ঢালে। বদ্রীনাথ থেকে ভারতের এই শেষ গ্রামে যাওয়ার রাস্তাও বেশ সুন্দর। মনে হবে কেউ যেন পরম যত্নে ঝুলন সাজিয়েছে অলাকানন্দার তীরে। সরু কাঁচা পথ ধরে এগিয়ে যেতে যেতেই মেঘের মধ্যে থেকে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠবে পাথর কাটা জনপদ। আচমকাই দেখতে পাবেন বাড়ির উঠোনে তুলো ছাড়ানোয় ব্যস্ত অশীতিপর বৃদ্ধা। বা স্নানের আগে ছেড়ে যাওয়া বাড়ির কচি সদস্যের চটিটা। এক কথায় মানা গ্রাম হল স্বপ্ন সুন্দর। আর এই গ্রামে বেড়ানোর সবচেয়ে বড় পাওনা হল ভারতের শেষ প্রান্তের চায়ের দোকানে চায়ের চুমুক। তীব্র শীতের মধ্যে এই উচ্চতায় মানা গ্রামের পাশেই রয়েছে হেমকুণ্ড। এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে ভারতের শেষ চায়ের দোকান। এখানে ইয়াকের দুধে তৈরি চায়ে চুমুক দিতেই গ্রাম ছাড়া ওই পাথুরে পথে আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার মেজাজ পাবেন। সঙ্গে চনমনে হয়ে উঠবে প্রাণ।

Post a Comment
Thank You for your important feedback