লোকাল ট্রেন চলবে অর্ধেকের কম, সামাজিক দূরত্ব মানা হবে তো?

 

কথায় আছে ‘সকালেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে’। আগামী বুধবার থেকে চালু হতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত লোকাল ট্রেন। আমি কলকাতার উত্তর শহরতলির  নৈহাটির বাসিন্দা মৌ দাস। একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। বিগত পাঁচবছরের বেশি সময় লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রী। করোনা কালে বন্ধ ছিল লোকাল ট্রেন। কিন্তু অফিস খুলে যাওয়ার পর বিকল্প বাহনেই অফিস যাতায়াত করেছি বাড়তি টাকা খরচ করে। নিত্যদিন ছিল করোনা সংক্রমণের ভয়। তবুও জীবিকার জন্য এই ঝুঁকি নিতেই হয়েছে। কিন্তু লোকাল চালু হলেই কী সেই ঝুঁকি কমবে? সোমবার একটি স্টাফ স্পেশাল ট্রেনে উঠে যা অভিজ্ঞতা হল, তাতে প্রাণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে বৈ কমবে না বলেই মনে হচ্ছে। 

 

 
করোনা সংক্রমণ আমাদের জীবনে একটা বড় ধাক্কা। প্রথমে কয়েকমাসের লকডাউন, এরপর ধীরে ধীরে আনলক পর্ব। আনলক-পাঁচের দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজ্য সরকার লোকাল ট্রেন চালুর অনুমতি দিয়েছে। এরমধ্যেই খুলে গিয়েছে সমস্ত সরকারি-বেসরকারি অফিস, শপিং মল, সিনেমা হল, হোটেল-রেস্তরাঁ। ফলে কাজের তাগিদে সকলকেই ঘর ছেড়ে বাইরে আসতে হয়েছে। কিন্তু গণপরিবহণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম লোকাল ট্রেনই বন্ধ ছিল। ফলে শহরতলির বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্মস্থল কলকাতায় পৌঁছাতে গ্যাটের কড়ি ভালোই খসাতে হয়েছে আম জনতাকে। সরকারি ও বেসরকারি বাসে গাদাগাদি ভিড়, ভাড়াও গুণতে হয়েছে তিন থেকে চার গুণ। করোনা কালে গণপরিবহণ চালু হলে দূরপাল্লার বেসরকারি বাসগুলি উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলির নিত্যযাত্রীদের জন্য কলকাতায় যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছিল রাজ্য পরিবহণ দফতর। বিলাসবহুল এই এসি-ননএসি বাসের ভাড়াও একটু বেশি। কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নেওয়ায় সচেতন মানুষদের কাছে জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল বাসগুলি। এছাড়াও কয়েকটি অ্যাপ নির্ভর বাস পরিষেবাও চালু হয়েছে এই সুযোগে। ফলে বেশি টাকা খরচ হলেও কয়েকটি বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল এই সময়ের মধ্যে। 

 


কিন্তু লোকাল ট্রেন চালু হওয়ার খবর মিলতেই দূরপাল্লার বাসগুলি একে একে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাস মালিকরা। এর পিছনে একটি কারণ রয়েছে।  করোনা কালে রেলকর্মীদের জন্য স্টাফ স্পেশাল ট্রেন চালাচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। বিগত কয়েকদিন এই ট্রেনে উঠতে চেয়ে বিভিন্ন স্টেশনে নিত্যযাত্রীরা গোলমাল পাকিয়েছে। আমরা খবরের কাগজ ও টিভি চ্যানেলগুলিতে দেখেছি। গত সপ্তাহে রেল কর্তৃপক্ষ এবং আরপিএফ আর স্টাফ স্পোশাল ট্রেনে উঠতে বাধা দিচ্ছে না। ফলে খরচ বাঁচাতে অনেকেই ওই ট্রেনে উঠে পড়ছেন। আর এই কারণেই ওই বিকল্প বাসে যাত্রী সংখ্যা হু হু করে কমে যায়। ফলে বাস তুলে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে বাসমালিকরা।

অবশেষে বুধবার থেকে চালু হতে চলেছে লোকাল ট্রেন। তাও আবার মাত্র ৪৫ শতাংশ ট্রেন চালাবে পূর্ব রেল। পূর্ব রেলের শিয়ালদা শাখায় ভিড় হয় সর্বাধিক।অফিস টাইমে নিত্যযাত্রীরা রীতিমতো গা ঘেঁষাঘেষি করেই যাতায়াত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু করোনা আবহে এটা করা মানে বিপদ মাথায় করে ডেকে নিয়ে আসা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে লোকাল ট্রেন চালু হলে সামাজিক দূরত্ব কতটা পালন হবে? এর উত্তরও পাওয়া গেল সোমবার সকালে। অনেকটা চাল সিদ্ধ হয়েছে কিনা জানতে একটি-দুটি চাল টিপলেই বোঝা যায়, সেরকমই ট্রেন চালুর আগে অফিস টাইমের স্টাফ স্পেশাল ট্রেনের অবস্থাই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির অনুমান করা যায়। বাসের সমস্যার জন্য সপ্তাহের প্রথম দিন সকালে স্টাফ স্পেশাল ট্রেনেই উঠে বসেছিলাম। নৈহাটি থেকে সকাল ৯টার বিবাদি বাগগামী স্পেশাল ট্রেনের লেডিস কামরায়। ট্রেন যতই এগোল ততই ভিড় বাড়ল। অনেকেই আমার মতো ওই ট্রেনে উঠছেন (হয়তো বাধ্য হয়েই)। কিন্তু সমস্যার শুরু একশ্রেণীর যাত্রীকে নিয়ে। যারা কোনওরকম সামাজিক দূরত্ব মানার সৌজন্য দেখাতে নারাজ। একটি সিটে তিনজনের পরিবর্তে দুজন করে বসার কথা বলছে রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ট্রেনে উঠেই অনেকে ওই মাঝের খালি সিটে বসার জন্য জোরাজুরি শুরু করে। ফলে বারেবারেই গোলমাল ও ঝগড়া বাঁধলো ট্রেনে। সিটে না বসতে দিতে চাইলেই মারধোরের ভয় দেখাতেও দ্বিধা করলেন না অনেকে। কারোর কারোর মুখে দেখলাম মাস্ক নেই। সেটা নিয়ে প্রতিবাদ করতেই উড়ে আসল অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ। এর চেয়েও বড় ঘটনা হল স্টাফ স্পেশাল ট্রেনে উঠে রেলকর্মীদের সঙ্গেই দুর্ব্যবহার। যেহেতু এটা স্টাফ স্পেশাল ট্রেন, সেহেতু এতে কোনও আলাদা করে লেডিস কামরা নেই। ফলে পুরুষ রেলকর্মীরা ওই কামরায় উঠেছেন, কিন্তু সাধারণ মহিলা যাত্রীরা এটা নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করে। ‘লেডিসে কেন ছেলেরা উঠে বসে আছেন? উঠুন উঠুন সিট ছাড়ুন’, প্রতিবাদ উড়ে এল কয়েকজনের থেকে। 

 


ওই পুরুষ রেলকর্মীরাও পাল্টা দাবি করলেন, ‘তাঁদের কাছে বৈধ পাস রয়েছে, আর আপনারাই অবৈধভাবে ট্রেনে উঠেছেন’। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শুরু হল তুমুল বাক-বিতন্ডা। অবশেষে অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যস্থতায় ক্ষান্ত হলেন ওই এক শ্রেণীর মহিলা। যারা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই নিত্যদিন আমাদের সেবা করে চলেছেন তাঁদের জন্য এতটুকু সৌজন্য ও ভদ্রতা দেখানোর প্রয়োজনই করলেন না ওই মহিলারা। ভাবলাম মহিলা কামরায় যদি এই অবস্থা হয় তবে জেনারেল কামরায় কি পরিস্থিতি হবে সেটা ভেবেই শিউরে উঠছি। 

 


 

 

ট্রেন দমদম পৌঁছানোর আগেই মাত্রাছাড়া ভিড় হল। নেই কোনও সামাজিক দূরত্বের বালাই। নেই কোনও কোভিডবিধি। অবাধ স্টেশন ও ট্রেন ততক্ষণে নিত্যযাত্রীদের দখলে চলে গিয়েছে। লোকাল ট্রেন চালুর আগেই যদি এই অবস্থা হয় তবে সরকারিভাবে ট্রেন চালু হলে কি অবস্থা হবে সেটা অনুমান করে রাতের ঘুম উড়তে বাধ্য। একজন সচেতন নিত্যযাত্রী হিসেবে আমরা বলতেই পারি লোকাল ট্রেনের প্রতিটি কামরায় জিআরপি ও আরপিএফ কর্মী দিতে হবে। তবে যদি কিছু হয়। নাহলে গোলমাল বড় আকার নিতে সময় লাগবে না।
(মতামত একান্ত ব্যক্তিগত)


Post a Comment

Thank You for your important feedback

أحدث أقدم