মোহময়ী প্যাংগং ও ব্রাহ্মণী হাঁস (লাদাখ ডায়রি-১)

 
পূর্ব লাদাখে ভারত-চিন সীমান্তে অবস্থিত প্যাংগং লেকের (Pangong Tso) নাম বর্তমানে ভারতবাসী মাত্রই জেনে গিয়েছেন। সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষ ও চিনের দখলদারি নিয়ে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে এই প্যাংগং লেকের নাম। তবে ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে প্যাংগং লেক কিন্তু চাঁদে যাওয়ার মতোই মনে হতে পারে। লাদাখের ভয়ানক উচ্চতায় এই লেকে পৌঁছানো যথেষ্ঠই কঠিন। তবে গাড়ি চলাচলের রাস্তা আছে, কিন্তু অত্যাধিক উচ্চতার কারণে এখানে সামান্য অসুবিধা হতেই পারে আম পর্যটকদের। যদিও এই লেকের ধারে তাঁবুতে রাত্রিবাসও করেন অনেকে। আসুন আজ জেনে নেওয়া যাক স্বর্গীয় এই লেকের বর্ণনা ও খুটিনাটি তথ্য।
Pangong Lake CN
সুন্দরী প্যাংগং
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট ওপরে লাদাখের উষর মরুভূমির মধ্যেই মরুদ্যানের মতোই বিধাতার এই আশীর্বাদ প্যাংগং লেক। নুব্রা ভ্যালি ছেড়ে আমরা চলেছি সুন্দরী প্যাংগং লেক দর্শনে। নুব্রা থেকে খালসার হয়ে প্যাংগঙের দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি। গাড়িতেই বসে নুব্রা ও লাদাখের আদিম ও অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল ড্রাইভারের ডাকে। তাঁরই দেখানো আঙ্গুলের দিকে তাঁকিয়ে দেখতে পেলাম দূরে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে এক চিলতে ঘন নীল জলরেখা। এটাই প্যাংগং লেকের প্রথম দর্শন। দেখেই মোহিত হয়ে গেলাম। এরপর গোটা রাস্তার বিভিন্ন বাঁকে কখনও উঁকি দিচ্ছে সুন্দরী প্যাংগং, কখনও আবার দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হচ্ছে। এই লুকোচুরি খেলার মধ্যেই যেন আচমকা পৌঁছে গেলাম প্যাংগঙের পারে। লেকের কাছে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। সারা লেক জুড়েই যেন রঙের বৈচিত্র্য। তীরের কাছে পান্না সবুজ একটু দুরে ময়ুরকন্ঠী নীল আরও দুরে গাড় নীল। স্বচ্ছ জলের তলায় নূড়ি-পাথর গুলো পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। আর স্বচ্ছ দীর্ঘ জলরাশিতে খেলা করছে প্রচুর ব্রাহ্মণী হাঁস
Pangong Lake CN
ক্লাইম্যাক্স
১৩৫ কিমি বিস্তৃত এই লেকের এক তৃতীয়াংশ ভারতে বাকিটা চিনের বা তিব্বতের অংশ। বলে রাখি, আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা 3-idiots Film-এর climax দৃশ্যের কথা মনে আছে? scooter চড়ে কারিনা কাপূর এই লেকের পার দিয়েই পৌঁছে গিয়েছিলেন র‍্যাঞ্চো বা আমির খানের কাছে। আজও এই লেকের ধারে ওই scooter-এর একটি মডেল রাখা আছে এখানে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ লবনাক্ত জলের হৃদ এটি। এই হৃদের জলে কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী ছাড়া কোনও মাছ নেই। তবে এখানে রয়েছে প্রচুর রাহ্মণী হাঁস, রাজহাঁস ও গাঙচিল। পাশাপাশি দূরের তিব্বত পাহাড় থেকে নেমে আসে কিয়াং নামে এক প্রকার বুনো গাধা। তবে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার জলের প্যাংগং লেকের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয় দূরের বাদামী-ধুসর পাহাড়ের রাশি ও পরিস্কার আকাশের পটভূমি। ঠান্ডা হাওয়ায় এই লেকের জলে ছোট ছোট ঢেউ খেলে। ঝকঝকে নীল আকাশ, মাঝেমধ্যে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘের আনাগোনা, আকাশের সঙ্গে মিতালি করে স্বচ্ছ- টলটলে লেকের জলের রং বদলের একান্ত খেলা। শোঁ শোঁ বাতাস, কনকনে ঠান্ডা, রুক্ষতা সত্ত্বেও আপনি উন্মাদ হয়ে যেতে চাইবেন প্যাংগঙের অপার সৌন্দর্যের আবেশে।

কিভাবে যাবেন, কবে যাবেন?
লে থেকে একদিনেই এই হৃদ দেখে ফিরে যাওয়া যায়। তবে তাতে সময় পাওয়া যাবে মাত্র ২-৩ ঘন্টা। লে শহর থেকে দূরত্ব ১৬৫ কিমি। আমরা নুব্রা থেকে প্যাংগং দেখে চলে যাবো লে শহরে। বলে রাখি এখানে গেলে সঙ্গে রাখুন শুকনো খাবার ও জল। কারণ এখানে কোনও দোকান পাওয়া যায়না। তবে ইদানীং সিজেনে কিছু দোকানপাট খোলা থাকে। আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই হৃদের তীরে একরাত কাটাতে পারেন। এই লেকের ধারেই রয়েছে রাত্রিবাসের জন্য সারি সারি তাঁবু। তবে এগুলি বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। এছাড়া লেকের পার দিয়ে চলে গিয়েছে একটি ছোট্ট রাস্তা। যেটি গিয়ে শেষ হয়েছে স্পাঙ্গমিক গ্রামে। এই গ্রামে গুটি কয়েক পরিবারের বাস। মূলত চাষবাস ও পশুপালণ করেই দিন চালায় গ্রামবাসীরা। তবে এখানেও থাকার জন্য গেষ্ট হাউজ রয়েছে। ঘুরে দেখা যায় 3-idiots সিনেমার বিখ্যাত সেই স্কুলটিও। আর পড়ন্ত বিকেলে মোহময়ী প্যাংগং লেকের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা একটা স্বর্গীয় অনুভূতি হয়ে সারাজীবন মনে থাকবে। প্যাংগং যেতে গেলে লাগবে ইনার লাইন পারমিট। এরজন্য আধার কার্ড ও দুটো পাসপোর্ট ছবি সঙ্গে রাখতে হবে।
Pangong Lake CN

প্যাংগং লেক ও এর আশপাশের অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি। শীতে এখানকার তাপমাত্রা নেমে যায় শূণ্যের ২০-২৫ ডিগ্রি নীচে। সেই সময় পুরো লেক পুরু বরফে ঢাকা থাকে। সেই কারণে এই লেক বছরের বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। লে থেকে প্যাংগং আসতে হলে অতিক্রম করতে হয় পৃথিবীর উচ্চতম যানচলাচলকারী চ্যাংলা পাস। মূলত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যাওয়া যায় প্যাংগঙে। লে থেকে এবং নুব্রা ভ্যালি থেকে প্রচুর গাড়ি পাবেন প্যাংগং যাওয়ার জন্য। বলে রাখি এই পথে যেতে হলে খরচ অনেকটাই বেশি। তাই দলে ৬ থেকে ৮ জন থাকলে একটু সুবিধা হবে।
Pangong Lake CN

Post a Comment

Thank You for your important feedback

Previous Post Next Post