নুব্রা ভ্যালি ও দু-কুঁজ বিশিষ্ট উট (লাদাখ ডায়রি-২)


হিমালয় পর্বতশ্রেণীর শেষ ও কারাকোরাম পর্বতশ্রেণীর শুরু, এমনই এক উপত্যাকা চাক্ষুস করতে হলে আপনাকে যেতে হলে লাদাখ। বা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে আপনাকে যেতে হবে নুব্রা ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,০০০ ফুট উচ্চতায় বরফের রাজত্ব হওয়ার বদলে এই অঞ্চল এক ছাই-রঙা মরুভূমি। আমাদের গন্তব্য নুব্রা ভ্যালি বা উপত্যাকা। যাকে উষর মরুভূমি বা শীতল মরুভূমি হিসেবেও বলা হয়ে থাকে। ঘন নীল আকাশ, ধুসর পাহাড়, শান্ত শীতল হ্রদ ও খরস্রোতা নদী নিয়ে নুব্রা আপনার জন্য এক অজানার দরজা খুলে স্বাগত করতে সদা প্রস্তুত। লাদাখের সবচেয়ে সুন্দর স্থান এই নুব্রা ভ্যালি। তবে শুধু সুন্দর বললে কম বলা হবে একে ভয়ঙ্কর সুন্দর বলা চলে। লাদাখের রাজধানী লে থেকে নুব্রা যেতে হলে পার হতে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে উচু যান চলাচলযোগ্য গিরিপাস খারদুং-লা।
khardungla pass CN
খারদুং-লা (১৮,৩৮০ ফুট)
যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১৮,৩৮০ ফুট। তবে সারা বছর এই গিরিপাস খোলা থাকেনা। কারণ বছরের বেশিরভাগ সময়ই বরফের জন্য বন্ধ থাকে এই গিরিপথ। সাধারণত মে মাস থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে খারদুং-লা। লে থেকে যার দুরত্ব ৪০ কিমি। কিন্তু এই ৪০ কিমি রাস্তাই পার হতে পিলে চমকে যেতে পারে। কারণ এই রাস্তার শেষের দিক অতি ভঙ্গুর, মাঝে মধ্যেই ধস ও অতিমাত্রায় বরফ পড়ার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO) দ্রুততার সঙ্গেই রাস্তা মেরামত করে দেয় এখানে। অত্যন্ত সংকীর্ণ এই রাস্তা, খারদুং লা-র দুই প্রান্তে দুটি চেকপোস্টের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রন করা হয়। এই পাসের ওপর বেশি সময় থাকা যায়না। কারণ উচ্চতাজনিত কারণে এই পাসের ওপর শারীরিক সমস্যা শুরু হতে পারে। এখানকার তাপমাত্রা খুবই কম থাকার জন্য, ভারী শীতের পোশাক, জুতো, গ্লাভস সঙ্গে রাখা দরকার। উচ্চতাজনিত সমস্যা হতে পারে এখানে। এছাড়া তীব্র ঠান্ডা। তাই পরিবেশ ও উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য লে শহরে দু-তিন দিন কাটিয়ে নেওয়াটা জরুরী।
Nubra Valley
শীতল মরুভূমি
নুব্রা ভ্যালি-
নুব্রা শব্দের অর্থ হল ‘সবুজ’। লাদাখের এই অংশটিই সবচেয়ে সবুজ। অধিক উচ্চতার পরও এখানে বরফের আধিক্য কম। রঙ-বেরঙের পাহাড়ের মাঝে ধুঁ ধুঁ প্রান্ত। তাই এটাকে শীতল মরুভূমি বলা হয়। বলা হয় নুব্রা ভ্যালিই হল লাদাখের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। সিয়াচেন হিমবাহের দুদিক থেকে উৎপন্ন নুব্রা ও সায়ক নদীর মাঝের অংশটিই নুব্রা উপত্যাকা (Nubra Vally) বলে পরিচিত। লে থেকে গাড়িতে নুব্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভূতি হচ্ছে মনে। কারণ বিশ্বের উচ্চতম মোটর চলাচলযোগ্য গিরিপাস পার হব আজ। প্রথম ২০ কিমি মসৃণ হলেও পরের রাস্তা অত্যন্ত খারাপ। পথের এক দিকের ঢাল পুরু বরফে মোড়া, অন্যদিকে গভীর খাদ। রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ উল্টোদিক থেকে কোনও গাড়ি এলে অতি সন্তর্পণে পাশ দিতে হচ্ছে। বরফ গলা জল ও কাদায় খানাখন্দময় রাস্তা দিয়ে প্রায় নাচতে নাচতেই গাড়ি উপরের দিকে উঠছে। বিআরও-র বুলডোজার মাঝেমধ্যেই বরফ পরিস্কার করে রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে। কোনও রকমে চলে এলাম খারদুং-লা (১৮,৩৮০ ফুট) এর উপরে।

সায়ক নদী (নুব্রা ভ্যালি)
এখানে বাতাসের চাপ খুবই কম। তাই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই পাসের ওপর রয়েছে কয়েকটি অস্থায়ী রেস্তরাঁ রয়েছে। চা ও জলখাবার পাওয়া যায়। রয়েছে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গুমটিও। ছবি তোলা ও দেখার জন্য সময় পাওয়া যায় মাত্র ১৫-২০ মিনিট। দেখা হল দেশী-বিদেশী বহু পর্যটক, যারা মোটরবাইকে এই পথে এসেছেন ভরপুর রোমাঞ্চের আশায়। এরপর ফের নামার পালা। বেশ খানিকটা নামার পর প্রথম জনপদ নর্থ পল্লু (১৪,০০০ ফুট)। এখানে হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়ে কয়েকটি জলধারা একত্রে একটি ছটফটে নদীর রূপ নিয়েছে। স্থানীয়রা এই নদীর নামই রেখেছেন ‘নুব্রা’। এখান থেকেই এক বিশাল রুক্ষ সমতল প্রান্তরের জন্ম হয়েছে। যেটা আমাদের গন্তব্য। পুব দিকের হিমালয়ের কোল ছেড়ে, পশ্চিম প্রান্তের কারাকোরামের গা ঘেঁষে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। এভাবে চলতে চলতে বেলা একটার কাছাকাছি পৌঁছানো গেল দিসকিট।

দিসকিট-
এখানেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার বিরতি। দিসকিট হল নুব্রা ভ্যালির হেড কোয়ার্টার। পান্না সবুজ উপত্যাকার বুক চিরে বয়ে চলেছে দুধসাদা শিয়ক নদী। দূরের পাহারের রঙ কোনটা নীল, কোনটা আবার ধুসর, আবার কোনটা হলদেটে। ফলে ধুধু মরুপ্রান্তরের ব্যকগ্রাউন্ডে বরফে মোড়া রঙ-বেরঙের পাহাড়ের রাশি। বেশ একটা সিনিক বিউটি দেখতে হলে আপনাদের আসতেই হবে নুব্রা ভ্যালিতে। দিসকিটে দেখে নেওয়া যায় দিসকিট গুম্ফা। এটিই নুব্রার বৃহত্তম গুম্ফা। যা এই জনপদের পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত। দিসকিটে প্রবেশের মুখেই আপনাকে স্বাগত জানাবে মৈত্রেয়ী বুদ্ধের এক বিশাল মূর্তি। ৩২ মিটার লম্বা এই বুদ্ধমূর্তি একটি ছোট পাহাড়ের মাথায় বসানো। অসাধারণ পরিবেশে এই বুদ্ধমূর্তিটি শিয়ক নদীর মুখ করে বসানো হয়েছে। যা পাকিস্তানের দিক অর্থাৎ পশ্চিম দিকে মুখ এই মৈত্রেয়ী বুদ্ধের। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে দশ মিনিটের ঘোরানো রাস্তা ধরে উঠে গেলাম মন্দির চত্বরে। প্রবল হাওয়ায় রঙ-বেঙরের পার্থনা পতাকা, সাদা চোর্তেন উড়ছে পতপত করে। আর এই পাহাড়ের ওপরে বৌদ্ধ মন্দিরের চাতাল থেকে দেখা যা য় হিমালয়ের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। লে শহর থেকে নুব্রা ভ্যালি যেতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘন্টা। তবে রাস্তার জন্য এই সময় ১০ ঘন্টাও লেগে যেতে পারে।

৩২ মিটার উচু মৈত্রেয়ী বুদ্ধের মূর্তি (দিসকিট)
দুই কুঁজ ওয়ালা উট-
দিসকিটেই পাওয়া গেল শীতল মরুভূমির জাহাজের। দুই কুঁজ ওয়ালা এক বিশেষ প্রজাতির উটের দেখা মেলে এই দিসকিটেই। এটিকে ব্যাকট্রিয়ান উট বলা হয় বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়। মরুভূমি অঞ্চলে যেমন উটের দেখা পাওয়া যায়, তেমনই শিতল মরুভূমি হিসেবে পরিচিত নুব্রা ভ্যালিতেও পাওয়া যায় এই দুই কুঁজ বিশিষ্ট উটের। আর এই প্রজাতির উট ভারতের একমাত্র নুব্রা ভ্যালিতেই পাওয়া যায়। ইতিহাসে জানা যায়, মোঙ্গল আক্রমণকারীদের সঙ্গেই এই দু-কুঁজ বিশিষ্ট উট এই অঞ্চলে এসেছে। শিতল মরুভূমির ঢেউ খেলানো সাদা বালিয়ারির বুকে ঘুরে বেড়ানো দুই কুঁজ বিশিষ্ট উটের চড়ে বেড়ানোর দৃশ্য চোখের আরাম। ফলে দিসকিটে দুপুরের খাবার খেয়েই চললাম সেই উট চড়তে।

দু-কুঁজ বিশিষ্ট উট
শহর থেকে পাঁচ কিমি দূরেই তাঁদের আড্ডা। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যেও ধুধু বালির প্রান্তরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে এক খড়শ্রোতা নালা। সামান্য পূবে উটের সহিসেরা পর্যটকদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। অতি উৎসাহে সেই উটের পিঠে উঠে পড়লাম। ধূসর বালুরাশিতে সাত-আটটি উটের সারিবদ্ধ পরিক্রমা যেমন ভারি দৃষ্টিনন্দন তেমনই বেশ আনন্দদায়কও বটে। রাত্রিবাস দিসকিট শহরেই। এখানে দেখে নেওয়া যায় হুন্টার গ্রাম। এই গ্রামের পাশেই দেখা মিলবে লাদাখের বিশেষ দ্রষ্টব্য শিতল মরুভূমির। এখানকার বালির রং ধবধবে সাদা। আর দূরে রঙিন পাহারের রাশি। সবমিলিয়ে মনে হবে অন্য কোনও জগতে পৌঁছে গেছি।

দিসকিট গুম্ফা

Post a Comment

Thank You for your important feedback

Previous Post Next Post